মো:আল-আমিন
ঢাকার কোলঘেঁষে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বর্ধিষ্ণু জনপদ কেরানীগঞ্জ। একদিকে বিপুল শিল্পকারখানা, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী পর্যটন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র এই এলাকাটি এখন বিদ্যুৎ সংকটের এক গোলকধাঁধায় আটকে আছে।
সম্প্রতি জিনজিরা,আটিবাজার,আরশিনগর,চরওয়াশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবন হেলে পড়া এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকির কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা নাজুক। তবে কেবল দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অবৈধ সংযোগ এবং অব্যবস্থাপনাই এখন এই জনপদের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেরানীগঞ্জ কেবল একটি আবাসিক এলাকা নয়; এখানকার অর্থনীতির চাকা ঘোরে কয়েক হাজার শিল্পকারখানা ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের ওপর ভর করে। বিসিক শিল্পনগরী থেকে শুরু করে ছোট-বড় কারখানাগুলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে ধুঁকছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, বাড়ছে খরচ। একই অবস্থা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও। আধুনিক শিক্ষার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ অপরিহার্য, কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিং ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আসা দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতেও বিদ্যুতের সুব্যবস্থা থাকা জরুরি।
কেরানীগঞ্জের বর্তমান বেহাল দশার পেছনে অবৈধ সংযোগ ও অব্যবস্থাপনার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে প্রায়ই নৈশ অভিযান পরিচালনা করা হলেও অবৈধ সংযোগের এই শেকড় অনেক গভীরে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ফলে সাধারণ গ্রাহকদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা নিরসনে কর্তৃপক্ষের আরও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে করণীয়:
১. শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ ফিডার: কলকারখানা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক ও শক্তিশালী বিদ্যুৎ ফিডারের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অর্থনীতির চাকা ও শিক্ষা কার্যক্রম থমকে না যায়।
২. ভূ-গর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইন (Underground Cables): কেরানীগঞ্জের জঞ্জালমুক্ত আধুনিক রূপ দিতে দ্রুততম সময়ে সব বিদ্যুৎ লাইন মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি বজ্রপাত ও ঝড়ের ঝুঁকি কমাবে।
৩. অবৈধ সংযোগ নির্মূল ও কঠোর নজরদারি: কেবল লোক দেখানো অভিযান নয়, বরং রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে স্থায়ীভাবে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘স্মার্ট মিটার’ স্থাপন একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
৪. অবকাঠামোগত উন্নয়ন: ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও সরু রাস্তার কারণে বিদ্যুৎ লাইনের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা রোধে রাজউক ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ সরবরাহ অবকাঠামো আধুনিকায়ন করতে হবে।
৫. পর্যটন ও জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র: হাসপাতাল ও পর্যটন এলাকায় ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎসের (সোলার বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড) সংস্থান করা প্রয়োজন।
কেরানীগঞ্জকে একটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। পরিকল্পনার ধীরগতি এবং পুরোনো অবকাঠামোর দোহাই দিয়ে জনভোগান্তিকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ আর নেই। আমরা আশা করি, বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত কেরানীগঞ্জের এই আঁধার দূর করবে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসুক, আলোকিত হোক আগামীর কেরানীগঞ্জ।
-মো:আল-আমিন
নির্বহী সম্পাদক, দৈনিক ভোরের হাওয়া
Leave a Reply